স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্পদের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন হাসনাত আবদুল্লাহর, এমপি-মন্ত্রীদের ব্যাংক হিসাব তলবের কড়া দাবি

নিউজ ডেস্ক | News Daily Bangla

প্রকাশিত: ০৩ অক্টোবর, ২০২৬

​স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সম্পদ বৃদ্ধি, অতীতের দুর্নীতির মামলা এবং ক্ষমতার উৎস নিয়ে এবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংসদ সদস্য ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ। বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পাশাপাশি বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফইউআই) উদ্দেশ্যে করে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, সরকারের বিরুদ্ধে কথা বললেই কি কেবল ব্যাংক হিসাব চাওয়া হবে? স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের স্বার্থে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ দেশের সকল এমপি, মন্ত্রী এবং তাদের নিকটাত্মীয়দের প্রতি বছরের ব্যাংক হিসাব তলব করার জোর দাবি জানিয়েছেন তিনি। একই সাথে তিনি নিজের ব্যাংক হিসাব তলব দিয়ে এই কার্যক্রম শুরু করার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন।

​অতীতের সাজা ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের খালাস

নিজের দীর্ঘ ফেসবুক পোস্টে হাসনাত আবদুল্লাহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অতীত রেকর্ড তুলে ধরে লেখেন, সালাহউদ্দিন আহমেদ সাবেক প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ১ কোটি টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১ কোটি টাকা জরিমানায় দণ্ডিত হয়েছিলেন। জরিমানা অনাদায়ে আরও ১ বছরের কারাদণ্ড ও ঘুষের টাকা বাজেয়াপ্তের নির্দেশ ছিল। একই বছর ৪ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপনের অন্য একটি দুর্নীতি মামলায় তার ১৩ বছরের সাজা হয়েছিল। এছাড়া চকরিয়ায় মাছের ঘের দখলেরও দুটি মামলা ছিল তার বিরুদ্ধে। বিএনপি ক্ষমতা ছাড়ার পর এসব মামলা হলেও সাম্প্রতিক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে তিনি এই মামলাগুলো থেকে খালাস পান। বিএনপি নেতারা এসব মামলাকে রাজনৈতিক হয়রানিমূলক দাবি করলেও, দলটির অনেক নেতাই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ছাড়া পেয়েছেন বলে পোস্টে উল্লেখ করা হয়।

​সরকারি চাকরি থেকে কোটি টাকার ফ্ল্যাট: সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন

হাসনাত আবদুল্লাহ সালাহউদ্দিন আহমেদের কর্মজীবন ও অর্জিত সম্পদের অসামঞ্জস্যতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলেন। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৮৫ ক্যাডারের বিসিএস প্রশাসন কর্মকর্তা হিসেবে সালাহউদ্দিন আহমেদ ১৯৯৬ সালে সিনিয়র সহকারী সচিব পদ থেকে ইস্তফা দেন, যখন তার মাসিক বেতন ছিল বড়জোর ৬ হাজার টাকা (বর্তমান মূল্যে যা প্রায় ৪০ হাজার টাকার সমান)। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বিরোধী দলে এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকায় তার ব্যবসা করার আইনি সুযোগ ছিল না। এরপর দুই বছর কারাগারে এবং পরবর্তী দীর্ঘ সময় বিএনপি বিরোধী দলে ছিল।

​এত বছর ক্ষমতায় না থেকেও এবং সরকারি চাকরির সীমিত আয়ের পর কীভাবে গুলশানের অন্যতম দামি ‘প্লাটিনাম রেসিডেন্স’-এ কোটি টাকার বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ক্রয় করা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। এছাড়া নির্বাচনী হলফনামার হিসাব তুলে ধরে হাসনাত আবদুল্লাহ জানান, ২০০৮ সালে সালাহউদ্দিন-হাসিনা দম্পতির মোট সম্পদ ছিল ৬.৩ কোটি টাকা, যা ২০১৮ সালে দাঁড়ায় ১২.৭ কোটি টাকায় এবং ২০২৫ সালে তা লাফিয়ে ৩০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। সন্তানদের পশ্চিমাদের উন্নত দেশে বিপুল খরচে পড়াশোনা করানোর পেছনে বৈধ অর্থের উৎস কী ছিল, তা রাষ্ট্রীয় স্বার্থে খতিয়ে দেখার আহ্বান জানানো হয়।

​সিলেক্টিভ পদক্ষেপ নাকি জনস্বার্থ?

সম্প্রতি কন্টেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ব্যাংক হিসাব তলবের প্রেক্ষাপট টেনে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, রাষ্ট্র চাইলেই যে কারও ব্যাংক হিসাব তলব করতে পারে। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বললেই কেবল ব্যাংক হিসাব তলব করা হয়। এটি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যদি সত্যিই রাষ্ট্রীয় কল্যাণের উদ্দেশ্যে এই তলব করা হয়, তবে শুধু ইউটিউবার বা কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের ওপর সীমাবদ্ধ না থেকে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিটা এমপি, মন্ত্রী এবং তাদের আত্মীয়স্বজনদের ব্যাংক হিসাব প্রতি বছর তলব করা উচিত।

​নিজের হিসাব দিয়ে শুরু করার আহ্বান

পোস্টের শেষ অংশে হাসনাত আবদুল্লাহ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার উদাহরণ টেনে বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টারা দায়িত্ব গ্রহণের আগে ও পরে নিজেদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করে একটি ইতিবাচক নজির গড়ে গেছেন। তিনি সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্তদের আত্মীয়স্বজনদের ব্যাংক হিসাব তলব করা হোক। আর আমাকে দিয়েই তা শুরু হোক।” এখন সরকারি এসব প্রতিষ্ঠান এমন সৎ সাহস দেখাতে পারবে কি না—সেটাই দেখার বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *