’গালি দেওয়া কি সন্ত্রাস?’—সিফাতের মুক্তিসহ ৩ দাবি ডা. তাসনিম জারার
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তি এবং রাষ্ট্রবিরোধী অপপ্রচারের অভিযোগে গাজীপুরে সিফাত আব্দুল্লাহ নামের এক যুবককে গ্রেপ্তারের ঘটনায় দেশজুড়ে তুমুল আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে তার বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইনে’ মামলা দেওয়ায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। এবার এই গ্রেপ্তারের কড়া সমালোচনা করেছেন জনপ্রিয় চিকিৎসক, এক্টিভিস্ট ও স্বাস্থ্যবিষয়ক কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ডা. তাসনিম জারা। তিনি এই মামলার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছেন, ‘গালি দেওয়া কি সন্ত্রাস?’ একইসঙ্গে তিনি অবিলম্বে সিফাতের মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।
আরো পড়ুন বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি বন্ধ করল নেপাল
প্রেক্ষাপট: সিফাত আব্দুল্লাহর গ্রেপ্তার ও অভিযোগ
ডা. তাসনিম জারার বক্তব্যের সূত্রপাত মূলত গত বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) রাতের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে। এদিন রাত সাড়ে ৮টার দিকে গাজীপুরের গাছা থানা পুলিশ সিফাত আব্দুল্লাহকে গ্রেপ্তার করে। গাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম রাব্বানীর দেওয়া তথ্যমতে, সিফাত আব্দুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে বিভিন্ন আপত্তিকর মন্তব্য ও লেখালেখি করে আসছিলেন। সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিল সংক্রান্ত একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে অশালীন ভাষায় কটূক্তি করেন।
পুলিশের দাবি, সিফাতের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপপ্রচার এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগসূত্র থাকার অভিযোগ রয়েছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় এবং শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) তাকে আদালতে পাঠানো হয়।
‘গালি দেওয়া কি সন্ত্রাস?’ — ডা. তাসনিম জারার প্রশ্ন
সিফাতকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানোর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পরই নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাস দেন ডা. তাসনিম জারা। সেখানে তিনি সিফাতের গ্রেপ্তার ও মামলার আইনি দিক নিয়ে বিস্তারিত মত তুলে ধরেন।
স্ট্যাটাসের শুরুতে ডা. জারা স্বীকার করেন যে সিফাতের ব্যবহৃত ভাষা সঠিক ছিল না। তিনি লেখেন, “সিফাতের ভাষা ভদ্র ছিল না। এটা নিয়ে তর্ক করার কিছু নাই। কিন্তু প্রশ্নটা ভদ্রতার নয়। কারণ সিফাতকে অভদ্রতার জন্য গ্রেপ্তার করা হয়নি। মামলা দেওয়া হয়েছে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে। তাহলে গালি দেওয়া কি সন্ত্রাস?”
তার এই প্রশ্নটি মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতপ্রকাশ এবং সেটির বিপরীতে রাষ্ট্রের কঠোর আইন প্রয়োগের যৌক্তিকতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

সমালোচকদের দ্বৈত নীতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ
যারা সিফাতের গ্রেপ্তারের পক্ষে সাফাই গাইছেন, তাদের দ্বৈত নীতিরও কড়া সমালোচনা করেন এই চিকিৎসক। তিনি তার স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেন, যারা এই গ্রেপ্তারের বিপক্ষে কথা বলছেন বা লিখছেন, তাদের কমেন্টবক্সে অনেকেই এসে গালির বন্যা বইয়ে দিচ্ছেন। ডা. জারা বিষয়টিকে ‘আয়রনি’ বা পরিহাস হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “যাঁরা গালি দিচ্ছেন, তাঁরা নিজেরাই গালি দিয়ে বলছেন যে ছেলেটা গালি দিয়েছে, তাই ধরা ঠিক হয়েছে।”
তিনি আরও লেখেন, এই গালিদাতাদের মনে কোনো ভয় নেই। কারণ তারা জানেন গালিটা তারা কাকে দিচ্ছেন আর কাকে দিচ্ছেন না। ডা. জারা আক্ষেপ করে বলেন, “অর্থাৎ ক্ষমতাসীন কাউকে গালি দিলে সেটা অপরাধ, ক্ষমতায় না থাকা কাউকে দিলে সেটা গ্রহণযোগ্য।”
আরো পড়ুন প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তি: সিফাত আবদুল্লাহ-র বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা, পাঠানো হলো আদালতে
কটাক্ষ করে চাইলেন ‘তালিকা’
বর্তমান পরিস্থিতিতে নাগরিকরা ঠিক কী বলতে পারবেন আর কী পারবেন না, তা নিয়ে কটাক্ষ করে ডা. জারা একটি ‘তালিকা’ দাবি করেন প্রশাসনের কাছে। তিনি তার স্ট্যাটাসে লেখেন, “আপনারা একটা তালিকা করে দিন। কী কী লিখলে, কী কী আঁকলে, বিলের কাগজ হাতে নিয়ে কী কী বললে রাত সাড়ে আটটায় দরজায় পুলিশ আসবে না। লিখে দিন। আমরা মেনে চলব।”
এরপর তিনি হলিউডের জনপ্রিয় ‘দ্য ডিক্টেটর’ সিনেমার মূল চরিত্র ‘আলাদিন’-এর স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, “আর যদি তালিকা দিতে অস্বস্তি হয়, ‘দ্য ডিক্টেটর’ সিনেমার আলাদিনের আচরণের মতো মনে হয়, তাহলে নিজেদের সংযত করুন।”
অবিলম্বে মুক্তি ও আইন সংশোধনের ৩ দাবি
স্ট্যাটাসের একদম শেষে বর্তমান পরিস্থিতি উত্তরণে ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিতে সুস্পষ্ট তিনটি দাবি তুলে ধরেন ডা. তাসনিম জারা। তার দাবিগুলো হলো:
১. সিফাত আব্দুল্লাহকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে।
২. তার বিরুদ্ধে দায়ের করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলাটি দ্রুত প্রত্যাহার করতে হবে।
৩. সন্ত্রাসবিরোধী আইনের যে ধারাগুলো মানুষের কথা বলার অধিকার বা মতপ্রকাশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যায় বা অপব্যবহারের সুযোগ রয়েছে, সেগুলো অবিলম্বে সংশোধন করতে হবে।
সিফাতের গ্রেপ্তার এবং এরপর ডা. তাসনিম জারার এই জোরালো অবস্থান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অনেকেই তার বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে ডিজিটাল স্পেসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে আওয়াজ তুলছেন।

