দড়ি টেনে নৌকা পার করেন প্রতিবন্ধী জনি, সেই আয়েই চলে ৬ সদস্যের সংসার
অলি রহমান, বাগেরহাট প্রতিনিধি | News Daily Bangla
প্রকাশিত: ০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বয়স ৩৫ বছর। শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, নেই অন্য কোনো ভারী কাজ করার সামর্থ্য। তবু জীবনযুদ্ধে হার মানেননি তিনি। ভোর হলেই হাতে তুলে নেন নৌকার সঙ্গে বাঁধা মোটা দড়ি। ভৈরব নদীর এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে দড়ি টেনে মানুষ পারাপারে সহযোগিতা করে দিনাতিপাত করেন প্রতিবন্ধী জনি মোল্লা। দিনভর হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে যে ৪০০ টাকা আয় করেন, তার পুরোটা হাসিমুখে তুলে দেন বাবার হাতে। অভাব-অনটনের মাঝে এই সামান্য আয়েই চলে তাঁদের পরিবারের ছয় সদস্যের সংসার।
আরো পড়ুন বাগেরহাটে চাঞ্চল্যকর তিন খুনের রহস্য উদঘাটন: পরকীয়ার জেরে হত্যাকাণ্ড, গ্রেপ্তার ৩
কে এই জনি মোল্লা?
বাগেরহাট সদর উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের কুলিয়া দাইড় গ্রামের বাসিন্দা জনি মোল্লা। তাঁর বাবা মনি মোল্লা পেশায় একজন জেলে। ছোটবেলা থেকেই নদী ও নৌকার সঙ্গে জনির অন্যরকম এক সখ্য। কখনো বাবার সঙ্গে নদীতে মাছ ধরেছেন, আবার কখনো নৌকা চালিয়ে মানুষ পারাপার করেছেন। বর্তমানে দীর্ঘ আট বছর ধরে বাগেরহাট সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের যাত্রাপুর বাজারসংলগ্ন কুলিয়া দাইড় খেয়াঘাটে দড়ি টেনে নৌকা পারাপারের কাজ করছেন তিনি। শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা থাকলেও কারও কাছে হাত না পেতে নিজের শ্রমে বেঁচে থাকার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন জনি।
অক্লান্ত পরিশ্রম ও জীবনযুদ্ধ
ভৈরব নদীর ওপর অবস্থিত এই কুলিয়া দাইড় খেয়াঘাটটি আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। প্রতিদিন শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীসহ প্রায় ৭০০ মানুষ এই ঘাট দিয়ে নদী পার হন। নৌকা ঘাটে এলেই জনির কাজ শুরু হয়। শক্ত হাতে দড়ি ধরে নদীর এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে টেনে নৌকা পার করেন তিনি। নদীর তীব্র স্রোত, প্রখর রোদ কিংবা মুষলধারে বৃষ্টি—কোনো কিছুই তাঁর এই কর্মযাত্রায় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।
প্রতিদিন ভোর ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ঘাটে থাকতে হয় জনিকে। তবে শারীরিক ও মানসিক সমস্যার কারণে তিনি সবসময় একটানা কাজ করতে পারেন না। সুস্থ বোধ করলে নৌকা টানেন, আবার অসুস্থ বোধ করলে ঘাটেই কিছু সময় বিশ্রাম নেন। বিশ্রাম শেষে পরিবারের সদস্যদের মুখ মনে পড়লে সুযোগ পেয়েই আবার কাজে ফিরে যান।
নিজের এই জীবনযুদ্ধ সম্পর্কে জনি মোল্লা বলেন, “ছোটবেলা থেকেই নৌকা চালাই। এই ঘাটে প্রায় আট বছর ধরে কাজ করছি। আমার শারীরিক ও মানসিক সমস্যা আছে। তারপরও সংসারের জন্য কাজ করতে হয়। পরিবারের ছয়জন সদস্য। দিনে কাজ করে ৪০০ টাকা পাই। এই টাকা পুরোটা আব্বুর হাতে দিয়ে দিই। আব্বু এই টাকা দিয়ে কোনোমতে সংসার চালান।”
আরো পড়ুন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিএনপিকে একাধিকবার ক্ষমতায় থাকতে হবে: ইশরাক হোসেন
স্থানীয়দের ভাষ্য ও সহমর্মিতা
ঘাটে নিয়মিত যাতায়াতকারী যাত্রী মনিরা বেগম জনির সম্পর্কে বলেন, “জনির শারীরিক সমস্যা রয়েছে, পাশাপাশি কিছুটা মানসিক সমস্যাও আছে। এই খেয়া টানা ছাড়া অন্য কোনো ভারী কাজ করার সামর্থ্য তাঁর নেই। সাত-আট বছর ধরে এ কাজ করেই তিনি সংসারে সহযোগিতা করছেন। জনি ভিক্ষা না করে খেটে খাচ্ছে। তাঁকে সরকারি বা বেসরকারিভাবে আর্থিক সহায়তা করা গেলে পরিবারটি আরেকটু ভালোভাবে চলতে পারত।”
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা মো. মেহেদী হাসান বলেন, “অনেকদিন ধরে জনিকে এই ঘাটে কাজ করতে দেখছি। ছেলেটার সমস্যা থাকা সত্ত্বেও সে অন্য কোনো কাজ করতে পারে না বলে এখানেই পড়ে থাকে। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নদীর ঘাটেই তাঁর জীবন কাটে।”
ঘাটের ইজারাদারের বক্তব্য
খেয়াঘাটের ইজারাদার মো. মাসুম মোল্লা জনির কাজের বিষয়ে বলেন, জনি দীর্ঘদিন ধরে এখানে দড়ি টেনে মানুষ পারাপারের কাজ করছেন। কাজের বিনিময়ে তাঁকে তিন বেলা খাবার, চা-নাশতা এবং প্রতিদিন নগদ ৪০০ টাকা দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে প্রতিদিন জনির পেছনে প্রায় ৫০০ টাকার মতো খরচ হয়। সুস্থ থাকলে সে ভোর ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত কাজ করে।
তিনি আরও বলেন, “জনি প্রতিবন্ধী ও খুবই গরিব পরিবারের সন্তান। তাঁদের কোনো জায়গা-জমি নেই। তাঁর বাবা নদীতে মাছ ধরে সংসার চালান। জনি প্রতিদিন যে ৪০০ টাকা পায়, সেটাও নিজে খরচ না করে পুরোটা বাবার হাতে তুলে দেয়। মূলত বাবা-ছেলের আয়েই কোনোমতে সংসার চলে।”
ভৈরব নদীর স্রোতের সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করে শত শত মানুষকে পারাপারে সহযোগিতা করছেন জনি। তাঁর ওই দুই হাতে শক্ত করে ধরা একটি দড়িই এখন ছয় সদস্যের পরিবারের বেঁচে থাকার অন্যতম অবলম্বন। জনি মোল্লার জীবনে বড় কোনো স্বপ্ন নেই। পরিবারের সদস্যদের মুখে দুবেলা দুমুঠো খাবার তুলে দিতে পারাটাই তাঁর জীবনের একমাত্র চাওয়া ও পাওয়া।

